পরিবর্তন সম্ভব! পরিবর্তন চাই!

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খায় অসাম্প্রদায়িক, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হোন

সংকটের সমাধান-গণতান্ত্রিক সংবিধান

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম বাংলাদেশের। অসংখ্য প্রাণ, বিপুল আত্মত্যাগ আর মরণপণ সংগ্রামের ফল আমাদের স্বাধীনতা। এত রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? আমাদের পূর্বপ্রজন্মের রক্তের দাম দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতার মূল্য কী আমরা দিতে পেরেছি? যে স্বপ্ন আর বিশ্বাস বুকে নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন এদেশের আপামর জনসাধারণ, সেই স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে? আমরা কি এমন বাংলাদেশে চেয়েছি যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু লুটেরাদের হাতে বন্দি আমাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট আর পাচার হয়ে যায় আর কোটি মানুষ নিরন্ন থাকে? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে আমাদের সম্পদ আমাদের নয়, দখলে চলে যায় সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির? আমরা কি সেই বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে আমাদের বন উজাড় হয়ে যায়, নদীকে মেরে ফেলা হয় প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে কোটি শিশু অপুষ্টিতে ভোগে আর প্রতিনিয়ত খাবারের নামে বিষ খেয়ে বিষাক্ত হয়ে ওঠে বেড়ে ওঠার আগেই? আমরা কি সেই বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে পঙ্গু হয়, মৃত্যুবরণ করে এদেশেরই নাগরিকরা? আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে মায়ের পেটে থাকতেই গুলিতে-লাথিতে মৃত্যুবরণ করতে হয় শিশুদের? আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে একের পর এক লেখক, প্রকাশক খুন হয়ে যায় আর চাপা পড়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনার আড়ালে? আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে সীমান্তে এদেশের নাগরিকরা হত্যা-নির্যাতনের শিকার হলেও রাষ্ট্র ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকে, এমনকি লোক দেখানো প্রতিবাদ পর্যন্ত করে না? আমরা কি এমন বাংলাদেশে চেয়েছি যেখানে হাজারো গার্মেন্টস শ্রমিকের মৃত্যুর পরও কারও বিচার হয় না, শ্রমিকের জীবিকার কোনো নিরাপত্তা নাই, কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পায় না, নারীর জীবন ও কর্মের কোনো নিরাপত্তা নাই? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে সংখ্যালঘু জাতি ও ধর্মের মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র শুধু ব্যর্থ নয়, ক্ষেত্রবিশেষে নিজেই আক্রমণকারী? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে আমাদের হাজার বছরের বহমান সংস্কৃিতর মত্যৃু ঘটে হলিউডি-বলিউডি বাজারি সংস্কৃিতর গ্রাসে? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি যেখানে রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় বিদেশী দূতাবাসের মাধ্যমে আর রাজনীতিবিদরা সমস্ত দেশটাকে বিক্রি করে হলেও ক্ষমতায় যেতে মানসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্না দেয় বিদেশীদের কাছে? আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি এই বাংলাদেশ আমরা চাইনি, আমাদের জন্য, আমাদের আগত এবং অনাগত প্রজন্মের জন্য এমন বাংলাদেশ আমরা চাই না। তাহলে কেমন বাংলাদেশ আমরা চেয়েছি? কেমন বাংলাদেশ আসলে সম্ভব? আমাদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বর্তমানের বাংলাদেশ থেকেই শুরু করতে হবে। সেখানে কী ধরনের পরিবর্তন সম্ভব সেই নিরিখেই সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে আমাদের। আমাদের বাস্তবতা আর স্বপ্নের নিরিখেই কিছু প্রস্তাব এখানে উত্থাপন করা হচ্ছে। যে প্রস্তাব আমরা উত্থাপন করছি তা চূড়ান্ত কিছু নয়, বরং কী হতে পারে তার একটা রূপরেখা মাত্র। জনগণের বিপুল অধিকাংশের অংশগ্রহণ আর সংগ্রামের মাধ্যমেই যা বাস্তবায়িত হতে পারে।

উৎপাদনী খাতের বিকাশ:

ক) বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বার বার হোঁচট খাওয়া, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, সাংবিধানিক সংকট–সবকিছুর গোড়ার সমস্যা হলো এদেশের অর্থনীতির অনুৎপাদক লুটেরা চরিত্র। অর্থনীতির এই অনুৎপাদক লুটেরা চরিত্র অব্যাহত রেখে যে ধরনের সংস্কারই করা হোক, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তাতে কোনো অর্থবহ পরিবর্তন সম্ভব নয়। সে কারণেই জনগণের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রথম কর্তব্যই হবে এই লুটেরা অর্থনীতির একটি উৎপাদনশীল রূপান্তর। এই রূপান্তরের প্রয়োজনে পদক্ষেপ নিতে হবে সমস্ত লুণ্ঠিত, পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত এনে তাকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের। একইভাবে উদ্যোগ নিতে হবে খেলাপী ঋণ উদ্ধারের আর তাকে যুক্ত করতে হবে দেশের উৎপাদনী আয়োজনের সাথে। প্রয়োজন মৌলিক উৎপাদনী খাতের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে এক্ষেত্রে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। বিশেষত বৃহদাকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্প এক্ষেত্রে পাবে অগ্রাধিকার। বিশেষ নজর দিতে হবে শিল্প বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি উৎপাদনের দিকে। বাংলাদেশের জনগণের বিভিন্ন অংশ শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসাবে তাদের আগ্রহের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, কিন্তু বিদ্যমান অর্থনীতির লুটেরা চরিত্র তাদের আকাঙ্খার প্রতিদান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অসংখ্য ক্ষুদে বিনিয়োগকারীকে গড়ে তুলতে হবে প্রকৃত উদ্যোক্তা হিসাবে। দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান, যাকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনাই বর্তমানে নেই। তেমনিভাবে দেশের বিপুল সম্পদের অপচয়মূলক ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংস হচ্ছে বিপুল সম্ভাবনা। সম্পদের অপচয় রোধ ও প্রবাসী আয়ের সুচিন্তিত ব্যবহার আমাদের এনে দিতে পারে প্রয়োজনীয় উৎপাদন ভিত্তি। দেশীয় উৎপাদনক্ষেত্র বিকাশের পরিপন্থী বিদেশী বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, এডিবি ইত্যাদির কর্তৃত্বের অবসান করে জাতীয় প্রয়োজনের নিরিখে সমস্ত উন্নয়ন নীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। গ্রহণ করতে হবে দেশীয় শিল্পের বিকাশের উপযোগী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তা দেশের উৎপাদনী খাত বিকাশে সহায়ক কিনা, বিদ্যমান দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্রের সাথে সংঘর্ষমূলক কিনা, এতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিধান আছে কিনা এবং জনশক্তির বিকাশে তা ভূমিকা রাখতে সক্ষম কিনা তার বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের জাতীয় প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন এক স্বনির্ভর উদ্যোক্তাশ্রেণি গড়ে তুলতে হবে, যারা হবেন স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এরকম একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতিই একটা সত্যিকার সার্বভৌম, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতির ভিত্তি রচনা করতে পারে, যা রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে গণতন্ত্রের শেকড়কে প্রোথিত করবে, যা থেকে রস পাবে প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এই বিকাশ আবার দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে তাকে পরিপুষ্ট হতে হবে কৃষিব্যবস্থার আমূল রূপান্তর ও অগ্রগতির মাধ্যমে। নিশ্চিত করতে হবে শিল্প ও কৃষির সঙ্গতিপূর্ণ ও পরিপূরক বিকাশ।

খ) বিপুল জনসংখ্যা এবং সীমিত জমির দেশ বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর খাদ্যের যোগান দেবার প্রয়োজন পূরণে কৃষিতে দিতে হবে বিশেষ মনোযোগ। আমূল ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে খোদ কৃষকের হাতে জমি দিতে হবে এবং তাদের সমবায় গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেদের পণ্য বাজারজাত করা ও ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন জমিপ্রাপ্তদের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। কৃষিকে কৃষকের বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে তাদের মুক্ত করতে হবে বহুজাতিক ব্যবসায়ী ও মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে। কৃষক জনসাধারণ হলেন সেই দেশপ্রেমিক অগ্রবাহিনী যারা বহুজাতিক কৃষি ব্যবসায়ীদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে জনগণের খাদ্যের এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার যোগান দিয়ে যাচ্ছেন। কৃষককে বহুজাতিক সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবসায়ীদের আগ্রাসন ও গ্রামাঞ্চলে এনজিও, মহাজনী ঋণের শোষণ থেকে রক্ষা করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োজনকে পূরণ করতে গোটা কৃষিব্যবস্থাকেই সাজাতে হবে স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে। অধিক সার, সেচ, কীটনাশক নির্ভর হাইব্রিড, জীনগতভাবে রূপান্তরিত বীজের চাষাবাদের আমূল রূপান্তর ঘটাতে হবে। স্থানীয় ভাল জাতের বীজের সুরক্ষা ও পরিচর্যা, বিশেষ গুণসম্পন্ন বীজের সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে তার উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে। জমিতে রাসায়নিক সারের অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে জমি যেভাবে তার উর্বরাশক্তি হারিয়ে ফেলছে তা পুনরুদ্ধারের জন্য জমিতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে, যাতে করে একটি প্রাণবান সত্ত্বা হিসাবে মাটি জৈব পদার্থ বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেই তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে পারে। মানবদেহ, কৃষি ও পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অণুজীব ও কীটপতঙ্গসহ সমগ্র প্রাণের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় কীটনাশকের ব্যবহার নিরোধ করে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার নীতি নিতে হবে। কৃষকের হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কৃষির কৃৎকৌশলগত অগ্রগতি সাধন করতে হবে, বহুজাতিকের পেটেন্টের থাবা থেকে প্রাণসম্পদ ও কৃষককে মুক্ত করতে হবে। কর্পোরেট মুনাফা নয়, জনগণের প্রয়োজনে কৃষি- এই নীতির প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে কৃষিকে পুনর্সজ্জা এবং কৃষি জমির অনুৎপাদনশীল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এরকম একটি কৃষিব্যবস্থার ওপরই গড়ে উঠতে পারে আমাদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব, যা আমাদের শক্তি ও সাহস যোগাবে জাতীয় পুনর্গঠনের এই বিপুল আয়োজনে।

জাতীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনমুখী ব্যবহার:

মৌলিক উৎপাদনমুখী খাতের এই বিকাশ, অর্থনীতির এই উৎপাদনশীল রূপান্তর আমরা কতটুকু সম্পন্ন করে তুলতে পারবো তা অনেকখানিই নির্ভর করে আমাদের জাতীয় সম্পদকে আমরা কতটুকু সক্ষমতার সাথে ব্যবহার করছি তার ওপর। অর্থাৎ আমাদের আলো, বাতাস, মাটি, পানি, খনিজ সম্পদ, সমুদ্র সম্পদ, মানব সম্পদ ইত্যাদিকে কতটুকু বিচক্ষণতা ও পরিকল্পনার সাথে আমরা ব্যবহার করতে পারছি। উৎপাদনভিত্তি প্রতিষ্ঠার একটা প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির যোগান। এই প্রয়োজনের বিবেচনায় পরিপূর্ণ জাতীয় মালিকানায় দেশের গ্যাস, কয়লা, তেল ইত্যাদির অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, ইতিমধ্যে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে হবে। জ্বালানি সম্পদের অনুৎপাদক ও অপচয়মূলক ব্যবহার রোধ করে তাকে উৎপাদনের কাজে লাগাতে হবে। সুজলা, সুফলা যে বাংলাদেশের কথা আমরা শুনে থাকি তার প্রাণ হলো এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদী ও জলাধার। এই নদী ও জলাধারের অনেকগুলোই আজ মৃত অথবা মৃতপ্রায়; দখল, ভরাট, বাঁধসহ নানা স্থাপনের কারণে। একটা ভাটির দেশ হবার ফলে বাংলাদেশের বেশির ভাগ নদীর স্রোতধারা নির্ভর করে উজানে ভারত থেকে আসা পানির ওপর। এসমস্ত আন্তর্জাতিক নদীর স্রোতধারা বাধাগ্রস্ত হবার ফলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। নদীসহ জলাভূমিকে দখলমুক্ত করে, নদীর স্রোতধারাকে বাধাহীন করে, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করে আমরা আমাদের কৃষি অর্থনীতির বিপুল উন্নতি করতে পারি। এগুলো হতে পারে মাছের অফুরান উৎস, যা শুধু অর্থনীতিকেই ঋদ্ধ করবে না, মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টিরও জোগান দেবে।

সমুদ্র আমাদের আরেক বিরাট সম্পদ। সমুদ্র যেমন মাছের উৎস তেমনি খাদ্যের এক বিপুল সম্ভাবনাময় অজানা ভান্ডার। সাথে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য মজুদও সমুদ্র। এই সমুদ্র সম্পদকে যথাযথ গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবহার করা গেলে তা আমাদের এগিয়ে দিতে পারে অনেক দূর। প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে উজাড় করে। কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর অবস্থিত হওয়ায় বছরের বেশিরভাগ সময় এখানে সূর্যালোক পাওয়া যায় ১৪-১৬ ঘণ্টা, যা আমাদের প্রকৃতিকে করেছে প্রাণবান, কর্মদিনকে করেছে দীর্ঘ। এই সূর্যালোককে আবার নবায়নযোগ্য দূষণহীন জ্বালানির উৎস হিসাবেও আমরা ব্যবহার করতে পারি। বর্তমান দুনিয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রমশ ফুরিয়ে আসায় এই সৌরশক্তি আমাদের সামনে এসেছে নতুন সম্ভাবনার বার্তা হিসেবে।

এ বিষয়ে গবেষণা ও আবিষ্কারে মনোযোগী হলে আমরাই পারি এ বিষয়ে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে। এছাড়াও বাংলাদেশে আছে চুনাপাথর, বেলে পাথর, তেজস্ক্রিয় বালিসহ নানা খনিজ সম্পদ। যা আমাদের সম্ভাবনার দিগন্তকে করতে পারে আরও প্রসারিত।

আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের আছে অসংখ্য মানুষ। প্রয়োজনীয় দক্ষতা, যোগ্যতা আর সৃজনশীলতায় যারা হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং খোদ সম্পদেরই স্রষ্টা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ:

আমরা দেখেছি বর্তমান সরকারের আমলেই ডিজিটাল বাংলাদেশের শ্লোগান কীভাবে তামাশায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় বিকাশ কিংবা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে জনগণের জীবনের অর্থবহ পরিবর্তনের বদলে তা হয়ে উঠেছে বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির হাতিয়ার। জাতীয় উৎপাদনী ক্ষেত্রের বিকাশের কর্মসূচিকে পাশ কাটিয়ে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ বদলে ফেলার চিন্তার পরিণতি এটাই হতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের স্বপ্নের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, স্বনির্ভর, জনগণের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের প্রয়োজনের সাথে আবশ্যিকভাবেই যুক্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ। যে নতুন আলোড়ন সমাজে তৈরি হবে, নানা খাতে যে নতুন চাহিদা তৈরি হবে তাকে পূরণে প্রয়োজন উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত বিকাশ। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমস্ত ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উৎসাহ, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, দ্রব্যাদি ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিশেষ মেধাকে ব্যবহার করা, গবেষণার মাধ্যমে তাকে উন্নততর করা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। প্রত্যেকটি উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত বিকাশের লক্ষ্যে পৃথিবীব্যাপী সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও জ্ঞানের সাথে মাতৃভাষার সম্পর্ক সৃষ্টি এবং সর্বাধুনিক ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা করতে হবে। সারা দুনিয়ার প্রযুক্তিগত বিকাশের সুবিধা সর্বস্তরের জনগণের জীবনের অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করতে হবে। সারা দেশে জনগণের ভেতর করতে হবে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারার বিকাশ। বাংলাদেশের তরুণরা ইতিমধ্যেই তথ্য প্রযুক্তিসহ বিজ্ঞানের নানা শাখায় তাদের সৃজনশীল প্রতিভার সম্ভাবনা দেখিয়ে চলেছেন। এখন প্রয়োজন এই শক্তিকে একটা মানবিক, প্রকৃতি উপযোগী উৎপাদনশীল জাতীয় বিকাশের লক্ষ্যে ব্যবহার।

কর্মদক্ষতার বিকাশ : শিক্ষা, স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা

রাষ্ট্র ও সমাজের যে বিকাশের কথা আমরা বলছি তার জন্য প্রয়োজন একে বাস্তবায়নের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি। অপুষ্ট, রুগ্ন, অদক্ষ, অশিক্ষিত, অনিশ্চিত জীবনযাপন করা মানুষেরা সত্যিকার কর্মদক্ষতার দিক থেকেও পিছিয়ে থাকে। কাজেই জনগোষ্ঠীকে বোঝা নয়, সত্যিকারের সম্পদে পরিণত করতে উদ্যোগী হতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজকেই। এই লক্ষ্যেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে জনগণের প্রাপ্য অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে।

ক) শিক্ষা:

শিক্ষা হলো একটি জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রকাশ ও তার ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনার হাতিয়ার। প্রতিটি সমাজ যে চাহিদা তৈরি করে তার উপযোগীভাবেই সেখানে শিক্ষা গড়ে ওঠে। ফলে আমাদের শিক্ষাকেও হতে হবে জাতীয় বিকাশের চাহিদা উপযোগী। কিন্তু শিক্ষা শুধু চলমানতারই নয় ভবিষ্যৎ বিকাশেরও হাতিয়ার। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হবে মানবিকতার বিকাশ, মানুষে মানুষে সাম্যের উচ্চতর নৈতিকতাবোধের, একটা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়া। বৈষম্যবিরোধী চিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঐক্য ও সংহতির বিকাশ ঘটাবে শিক্ষা। তারুণ্যের শক্তি চিরকালই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সর্বত্রই তরুণ থেকেছে অগ্রভাবে। তারুণ্যের এই শক্তিকে যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে কর্মদক্ষতা আর সৃজনশীলতায় বিকশিত করতে পারলে বাংলাদেশকে তারাই নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারেন।

আমাদের অন্যতম জাতীয় দুর্ভাগ্য এই যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তার শরীরে এখনও উপনিবেশিকতার চিহ্ন বহন করে চলেছে। তার কাঠামোয় যেমন তেমনি তার চিন্তার চর্চায়ও। শিক্ষাক্ষেত্রে এই উপনিবেশিক চিন্তার আধিপত্য দূর করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কেননা এই উপনিবেশিক শিক্ষা যে জাতীয় হীনমন্যতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সাথে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে তা যে কোন দেশের স্বাধীন বিকাশের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। এই হীনমন্যতা দূর করে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শন, সংস্কৃতির পাটাতনে শিক্ষাব্যবস্থার এমন সংস্কার সাধন করতে হবে যা নিজেদের ক্ষমতায় আস্থা তৈরি করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনের জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গী করবে শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজন বুনিয়াদী শিক্ষায় বর্তমান মুখস্থবিদ্যা নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির বদলে সত্যিকার জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশের উপযোগী করে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, পাঠদান পদ্ধতি ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানো। জাতীয় বিকাশের প্রয়োজনকে সামনে রেখে বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার বিকাশ। বুনিয়াদী শিক্ষাকে সার্বজনীন, অবৈতনিক ও মানসম্মত করার উদ্যোগ গ্রহণ। শিক্ষার প্রয়োজনীয় মান নিশ্চিত করতে যোগ্যতাসম্পন্ন ও নিবেদিত শিক্ষক তৈরি। এক্ষেত্রে আত্মনিয়োগে উৎসাহিত করতে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ জাতীয় বেতন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উচ্চশিক্ষাকে করতে হবে নিবিড় জ্ঞানানুশীলন, গবেষণা ও সার্বিক অগ্রগতির হাতিয়ার। শিক্ষাকে বিস্তৃত ও গভীর করতে সকলের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন পাঠ্যপুস্তক তৈরি, ধ্রুপদী সাহিত্য ও পাঠ্যপুস্তককে মাতৃভাষায় রূপান্তরের জন্য একটি জাতীয় অনুবাদ সংস্থা স্থাপন এবং দ্রুত এই কাজ সম্পন্ন করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শ্রেণি, বর্ণ, জাতি, নারী বিদ্বেষী সমস্ত উপাদান থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের উপযোগী করে শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ঘটাতে হবে।

খ. স্বাস্থ্য:

একটি সুস্থ, সবল জনগোষ্ঠীই পারে দেশকে তার কাঙ্খিত অগ্রগতির দিকে নিয়ে যেতে। এক্ষেত্রে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে অসুস্থতার কারণ দূর করে সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা বিধানের চেষ্টা এবং অসুস্থ হলে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন রাষ্ট্রের কাছে সমান মূল্যবান এই নীতিতে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা। সেজন্য প্রত্যেক নাগরিকের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। অসুস্থতা সৃষ্টিকারী পরিবেশ, খাদ্যে ভেজাল, ফরমালিনসহ নানা বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রণ ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর আইন-কানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। শিশুখাদ্যের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিধান করতে হবে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার নীতি। বিদ্যমান অবকাঠামোর পূর্ণ ব্যবহার এবং গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে এ লক্ষ্যে। চিকিৎসাবিদ্যাকে সামগ্রিকভাবে অনিয়ন্ত্রিত মুনাফাবৃদ্ধির হাতিয়ার হওয়া থেকে মুক্ত করে জনগণের প্রয়োজন মেটানোর দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চিকিৎসাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক তরুণকে চিকিৎসা শিক্ষা দিতে হবে। দেশীয় ভেষজ, কবিরাজি, হেকিমি, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতির নিবিড় গবেষণা ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদের সংরক্ষণ ও চাষাবাদেও দিতে হবে যথাযথ গুরুত্ব।

একটি শিক্ষিত, কর্মোদ্যোগী জাতিই পারে জাতীয় উদ্যম সৃষ্টির মাধ্যমে অগ্রগতির সোপান রচনা করতে। এই জনগোষ্ঠী আবার কী ধরনের আবাসস্থলে বসবাস করছেন, গোটা দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নগরায়নের পরিকল্পনা তার সক্রিয়তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সেটাও সমান বিবেচ্য। বাসস্থান, ভূমি

ব্যবস্থাপনা ও নগরায়ন:

বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। এখানে মাথাপিছু জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। ফলে ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভূমির দখল, অপচয়মূলক ব্যবহার নিরোধ করে মাথাপিছু ভূমি ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ভূমি মালিকানার বিরাজমান এবং ক্রমশ বেড়ে চলা বৈষম্য পুরো দেশকেই নিয়ে যাচ্ছে এক চরম অসম, ভারসাম্যহীন অবস্থার দিকে; যা সমাজকে চরম অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং এই ধরনের মালিকানা সুষম জাতীয় বিকাশেরও পরিপন্থী। এই মালিকানা ব্যবস্থার এমন রূপান্তর করতে হবে যাতে করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় বিকাশ নিশ্চিত হয়।

এজন্য বর্তমানে কেন্দ্রীভূত নগর ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান বড় বড় নগরের সম্প্রসারণের বদলে নগর ও গ্রামের বৈষম্য কমিয়ে আনতে এবং বিকেন্দ্রীভূত পরিকল্পিত নগরায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে নজর দিতে হবে সর্বনিম্ন ভূমি ব্যবহার করে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর বাসস্থান, পরিবহন ব্যবস্থা, নগরের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, পার্ক, খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি নির্মাণে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং উৎপাদন এলাকাকে নগরের উপকণ্ঠে সরিয়ে বড় নগরগুলোর ওপর চাপ কমাতে হবে। সকলের জন্য সুবিধাজনক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে বিদ্যমান নদী ও জলাধারাকে দখলমুক্ত করে পরিকল্পিত উপায়ে তাদের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নৌ পরিবহন ব্যবস্থা চালু এবং রেল উন্নয়নের। প্রয়োজনে রেলওয়ে ও নৌপথকে দ্রুত উন্নত করতে বিশেষ কমিশন গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাসস্থানের সাথে বৃক্ষরোপণ, জলাধার তৈরি ইত্যাদিকে উৎসাহিত করা হবে এবং সার্বিকভাবে এই আবাসন খাতকে লুটেরা, দখলদারদের উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার বদলে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী এর বিকাশের।

কর্মসংস্থান, মজুরি, নিরাপত্তা, আয়-ব্যয়ের সঙ্গতি বিধান:

অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী গতিশীলতার প্রয়োজনেই দরকার উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গতি। উৎপাদন লাভজনক ও পুনঃবিনিয়োগযোগ্য হতে পারে ভোক্তার যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে। আর এই ভোক্তাশ্রেণি তৈরি করতে প্রয়োজন জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃত আয়ের বৃদ্ধি। এই লক্ষ্যে সমগ্র উৎপাদনী আয়োজনে গুরুত্ব দিতে হবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর, শ্রমিকদের সম্মানজনকভাবে বাঁচার মতো মজুরির নিশ্চয়তা প্রদান, নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টির ওপর। একটি জাতীয় মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে আয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সমাজের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে কলকারখানায় ট্রেড ইউনিয়নসহ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হবার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসব ভাতা প্রদানের এবং বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সাথে যুক্ত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎসও তারা। অথচ তারা প্রতিনিয়তই নানা হয়রানির শিকার হন, তাদের অধিকার-মর্যাদা কোনো বিষয়েই এই রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিচ্ছে না। অথচ প্রবাসী শ্রমিকদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করলে, তাদের আয়কে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা গেলে, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে, দেশের প্রতি তাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের জন্য কল্যাণ তহবিল ও পেনশন নিশ্চিত করলে তারা দেশের অগ্রগতির নতুন পর্ব রচনা করতে পারেন। নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে রাষ্ট্রের। কর্মস্থল, রাস্তাঘাট, বসবাসের স্থানসহ দেশের সবর্ত্র নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এই লক্ষ্যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে করতে হবে আধুনিক ও গণমুখী। অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনার বস্তুগত ও সাংস্কৃতিক আয়োজন জোরদার করতে হবে।

একদিকে যেমন জনগণের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যদিকে তেমনি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে মধ্যসত্ত্বভোগী, দালাল, ফড়িয়াদের অনিয়ন্ত্রিত মুনাফার প্রবণতা রোধ করতে সিন্ডিকেট উচ্ছেদ করতে হবে। বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ব্যয় ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের জীবনে আয় ও ব্যয়ের সঙ্গতি বিধান করতে হবে।

মৌলিক মানবিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা:

যে সমাজে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রুদ্ধ, সে সমাজ বদ্ধ, গতিহীন। চিন্তার স্বাধীনতা ও সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া কোন গণতান্ত্রিক সমাজের নির্মাণ সম্ভব নয়। সে কারণে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রথম শর্তই হবে এসব অধিকারের স্বীকৃতি ও তার পরিপালনের নিশ্চয়তা। যে বাংলাদেশ আমরা নির্মাণ করতে চাই সেখানে শ্রেণি, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের থাকবে চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। থাকবে প্রত্যেকেরই নিজ চিন্তা অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়া, পার্টি গঠন, সমালোচনা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার। ধর্মকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে সকল নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন করার অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। ধর্মের নামে সকল জবরদস্তির অবসান ঘটানো হবে। যুদ্ধাপরাধী ও গণশত্রুদের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। সকল রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন করে সত্যিকার রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। ক্রসফায়ার, গুম-খুনসহ সকল মৌলিক মানবাধিকার বিরোধী রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ বন্ধ করে প্রত্যেক নাগরিকের দেশের আইন অনুযায়ী বিচার পাবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ‘আইনের চোখে সকলেই সমান’ এই নীতির অবলম্বনে দেশে ন্যায়বিচার কায়েম এবং ঘুষ, দুর্নীতি, লুণ্ঠন ইত্যাদির হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সকলের জন্য সুযোগ ও অধিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা। সংবাদপত্র, প্রকাশনা, টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড ও নীতি সম্পর্কে জনগণকে সম্যক অবহিত করা হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং জনগণের দিক থেকে তা জানার ও জবাবদিহিতা চাইবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

জাতীয় সংস্কৃতির ধারায় মুক্ত ও গণসংস্কৃতির নির্মাণ:

এই বিরাটাকার পুনঃনির্মাণ কোন হুকুমদারি কিংবা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন জনগণের ভেতরে জৈবিকভাবে এই নির্মাণ উপযোগী চেতনার বিস্তার। প্রয়োজন দেশ জুড়ে জনগণের এক সাংস্কৃতিক জাগরণ। এই জাগরণের ভিত্তি হতে হবে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বহমান ধারা। নিজের সংস্কৃতির শেকড় থেকে রস আহরণ করতে না পারলে সেই সংস্কৃতি জনগণকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়ে তার জীবন যাপন ও মানস কাঠামোকে বদলে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। এজন্য বহু বছর যাবৎ বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপনের সাথে সম্পর্কিতভাবে যেসব সাংস্কৃতিক প্রকরণ তৈরি হয়েছে তাকে নতুন প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পর্কিত করে বিনির্মাণ করতে হবে। সারা দুনিয়ার মানুষের সাংস্কৃতিক অর্জনই মানবজাতির অংশ হিসেবে আমাদের অর্জন। সেই অর্জনের ধারাকে আমাদের সাথে যুক্ত করতে হবে। নিজস্বতার শেকড় থেকে রস নিয়ে আমাদের মেলতে হবে বৈচিত্র্যের ডালপালা। এরকম সাংস্কৃতিক নির্মাণের মাধ্যমেই আমাদের লড়াই করতে হবে উপনিবেশিক দাসসুলভ সংস্কৃতির। মোকাবেলা করতে হবে ভোগসর্বস্ব পণ্য সংস্কৃতির। মানুষে মানুষে ব্যবধান সৃষ্টির, নারীর অবমাননার কিংবা প্রকৃতির ওপর আধিপত্য করার দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই করার উপযোগী মুক্ত ও গণসংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে হবে। এটা এমন এক চিন্তাকে সমাজে প্রোথিত করবে যা ব্যক্তিকে ব্যক্তিসর্বস্বতায় পর্যবসিত না করে ব্যক্তির বিকাশের সাথে সমাজের যোগযোগ স্থাপন করবে। এটা একই সাথে হবে কর্মের সংস্কৃতি- যা মানুষের শ্রমকে আনন্দদায়ক, সৃষ্টিশীল করবে। বিদ্যমান বিচ্ছিন্নতাকে মুক্ত করে শ্রমকে মানুষের অস্তিত্বের শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা:

সারা দুনিয়াতে যেমন তেমনি বাংলাদেশেও জনসংখ্যার অর্ধেক হলো নারী। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রেখে কোন জাতিই অগ্রগতির আশা করতে পারে না। আমাদের দেশের নারীরা শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে, শিল্পকলায়, রাজনীতি ও সমাজে নানাভাবে তাদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এখনো সমাজে নারী বিষয়ে সেকেলে, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য। রাষ্ট্র নারীর অধিকারের নানা হাঁকডাক দিলেও এখনও সম্পত্তিতে সমানাধিকারের স্বীকৃতি নেই, নানা বৈষম্যমূলক আইন ও বিধিব্যবস্থা নারীর অগ্রগতিকে পেছনে টেনে ধরে রেখেছে। ফলে একটি বিপুল অংশ কর্মকুশলতা ও সৃজনশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। জাতি হিসেবে আমাদের বিকাশ সম্পূর্ণ করতে হলে নারীকে বিকশিত হতে দিতে হবে স্বমহিমায়। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তর থেকে পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব ও ধ্যান-ধারণার অবসান ঘটিয়ে সমমর্যাদা ও অধিকারের ভিত্তিতে সম্পত্তির সমঅধিকার, মজুিরসহ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে হবে নারীপুরুষের সমানাধিকার। নারীর ওপর যৌন নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন সামাজিক প্রতিরোধ সৃষ্টির চেতনা বিস্তার করতে হবে, অন্যদিকে অপরাধীদের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এখনো পর্যন্ত নারীরা কমর্ক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেমন নানা ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হন, তেমনি পথেও তারা নিরাপদ নন, নতুন করে  যুক্ত হয়েছে তথ্য প্রযুক্তি মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা হয়রানি, নির্যাতন। অবিলম্বে এ অবস্থার অবসান ঘটাতে কাযর্কর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর সন্তান জন্মদানকে রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় মানব সম্পদের বিকাশ হিসেবে চিহ্নিত করে তার প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে, কমর্ক্ষেত্রে নিযুক্ত নারীদের অন্তত ৬ মাস সবেতন ছুটি সর্বস্তরে কাযর্কর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারীর পেশা, প্রেম, বিবাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বে অবসান ঘটিয়ে নারীকেই নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সমাজকে সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। গার্হস্থ্য শ্রমে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মনোভাবের বিস্তৃতিঘটাতে হবে, যাতে করে নারীপুরুষ নিবির্শেষে সকলেই জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

সকল জাতি, সম্প্রদায়ের অধিকারের প্রতিষ্ঠা ও জাতিগত বৈচিত্র্যের বিকাশ:

বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ধর্মের মানুষের উপস্থিতি আমাদের জাতিকে করেছে বর্ণময়, বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই বৈচিত্র্য আমাদের দেশকে পরিচিতি দিয়েছে মেলা, পার্বণ আর উৎসবের দেশ হিসাবে। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আমাদের রক্ষা করতে হবে, তাকে আরো বিকশিত করতে হবে। একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সকল জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে, অবসান ঘটাতে হবে জাতি-ধর্ম ভেদে সকল বৈষম্যের। প্রত্যেক জাতিসত্ত্বার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক জীবন যাপন, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনা এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে।

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক স্মারককে রক্ষা করা, তাকে আমাদের ইতিহাসের, ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে জনগণের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয় আয়োজন করতে হবে। প্রত্যেক জাতির সংস্কৃতির বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড়ী জাতিসমূহের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে, উন্নয়নের নামে পাহাড় ধ্বংস করে তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা বন্ধ করতে হবে।

চাকুরির ক্ষেত্রে সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুেষর সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ধমীর্য় স্বাধীনতা এবং সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষের ধর্মচর্চার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রকৃতির সুরক্ষা:

প্রকৃতির প্রশ্ন এখন আর নিছক প্রকৃতিপ্রেমে সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৃতিকে রক্ষা করার সংগ্রাম এখন মানব জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আজ আশু প্রশ্ন আকারেই হাজির হয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের ক্ষেত্রে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হিসেবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমান মাত্রায় উষ্ণায়ন চলতে থাকলে কয়েক দশকের মধ্যেই দেশের একটা বড় অংশ তলিয়ে যাবার শঙ্কার ভেতরে বসবাস করছি আমরা। দেশের বন উজাড় হয়েছে, নদী-জলাধার দখল হয়েছে, দূষিত হয়েছে, স্রোতধারা ক্ষীণ হয়ে মরে গেছে, মাটি দূষিত হয়েছে, নিষ্ফলা হয়েছে, বাতাস হয়েছে দূষিত। এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলেই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে আমাদের। কাজেই ধ্বংসের হাত থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করাই হবে আমাদের প্রথম কর্তব্য। আর প্রকৃতিকে রক্ষা করে তাকে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে ব্যবহার করতে পারলে প্রকৃতির অফুরান দানে সমৃদ্ধ হতে পারি আমরা।

সেজন্য আমাদের শিল্প, কৃষি, বাসস্থান, পরিবহন সর্বক্ষেত্রেই প্রকৃতি উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিল্পবর্জ্যের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ রোধ করতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে জৈব সার ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার নীতি নিতে হবে। বন ধ্বংসকারী সমস্ত তৎপরতা বন্ধ করে বনগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়পূরণের সুযোগ দিতে হবে। নদী ও জলাভূমিকে দখলমুক্ত করতে হবে, নদী দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধাসৃষ্টিকারী নতুন স্থাপনা বন্ধ করতে হবে, সম্ভব সমস্ত ক্ষেত্রে এ ধরনের স্থাপনা অপসারণ করতে হবে। ভাটির দেশ হবার কারণে বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীর নাব্যতার সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষত ভারতের পদক্ষেপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সেক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধাদানের যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। উজানে নদীর পানি সরিয়ে নেবার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করে আমাদের নদীগুলোকে বাঁচানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনভেনশনে স্বাক্ষর করা এবং বন্ধু রাষ্ট্রসমূহকে স্বাক্ষর করার উৎসাহ যোগানের মাধ্যমে একে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহমানতা বজায় রাখতে ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনতে মতামত গঠনে নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তার প্রভাবে জলবায়ুগত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াতে সীমাবদ্ধ না থেকে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে ভূমিকা পালন করতে হবে আমাদের। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী উন্নত বিশ্বকে এর জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, খনিজ সম্পদ উত্তোলন ইত্যাদির জন্য নিতে হবে প্রকৃতি উপযোগী ব্যবস্থা। এসব নীতি অনুযায়ী প্রকৃতি ধ্বংস প্রতিরোধ করে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োজন মেটানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রকৃতির উপর দখলদারি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চিন্তাকে বিরোধিতা করে প্রকৃতির অংশ হিসাবে বেঁচে থাকার ও মানুষ-প্রকৃতি মেলবন্ধনের চিন্তার বিস্তার ঘটাতে হবে এই লক্ষ্যে।

এরকম বাংলাদেশ পেতে হলে রাষ্ট্র কাঠামোর যে বদল দরকার :

এ কথা বলা প্রায় অপ্রয়োজনীয় যে, বিদ্যমান ক্ষমতাসম্পর্ক ও রাষ্ট্র কাঠামো অক্ষুন্ন রেখে আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ অর্জন করতে পারবো না। বিদ্যমান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী চরিত্রের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে একটি অসাম্প্রদায়িক, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

সংবিধান :

সংবিধান হলো একটি জনগোষ্ঠীর জাতীয় আকাঙ্খার প্রকাশ। এই আকাঙ্খা মূর্ত হয় তার জীবনযাপনে, সংগ্রামে। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সংবিধান তাই মুক্তিযুদ্ধে জনগণের আকাঙ্খার প্রকাশ হবে তাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের যে আকাঙ্খা ফুটে উঠেছে, বাংলাদেশের সংবিধান সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই জনপদের মানুষের যে নতুন উচ্চতর জাতীয় চেতনা বিকশিত হয়েছে তাকে ধারণ করতে প্রয়োজন ছিলো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষকে সংবিধান প্রণয়নে যুক্ত করা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং তার বদলে পুরোনো পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য যাদের নির্বাচিত করা হয়েছিল, তাদেরই জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা হিসেবে। আর এর মাধ্যমে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে মূলনীতির ঘোষণা থাকলেও সমগ্র কাঠামোতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র ও স্বনির্ভর জাতীয় বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিস্তার ও সাম্যের উচ্চতর আকাঙ্খা তৈরি হয়েছিল তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপযোগী ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতা কাঠামোর বদলে তৈরি করা হয়েছে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো। ফলে এই সংবিধান শুধু প্রকৃত সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, একদিকে বৈধতা দিয়েছে অগণতান্ত্রিক বিধিবিধান এমনকি সামরিক শাসনকেও, অন্যদিকে লুণ্ঠন-দুর্নীতি আর ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের হাতিয়ার হয়ে উঠে জন্ম দিয়েছে স্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের। সে কারণে জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে এখন প্রয়োজন নতুন এক জাতীয় লক্ষ্য- মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। সংবিধানের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তরে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অনুষ্ঠিত হবে সংবিধান সভার নির্বাচন। সেখানে নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধিগণ সংবিধানের গণতান্ত্রিক প্রস্তাবনা প্রণয়ন ও উপস্থাপন করবেন, জনগণের বিপুল অধিকাংশের কাছে তা নিয়ে যাবার ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এবং এরপর গণরায়ের মাধ্যমে তা অনুমোদিত বা অননুমোদিত হবে। সংবিধানের রক্ষক হবেন জনগণ। জনগণের রায় ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সংবিধান কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করবেন। সরকারের দায়িত্ব হবে সংবিধান সংরক্ষণ ও দেশে সাংবিধানিক শাসন নিশ্চিত করা। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেবেন। কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংবিধান লঙ্ঘন করলে তাকে অভিশংসনের ব্যবস্থা থাকবে। জনগণের প্রতিনিধিরা তার স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হলে তাদের প্রত্যাহারের ব্যবস্থা থাকবে। কোনো অবস্থাতেই জনগণের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার বাতিল বা স্থগিত করা যাবে না।

সংবিধান হবে মৌলিক মানবিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের রক্ষাকবচ এবং তা আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য হবে। জাতীয় পর্যায়ে বহির্বিশ্বের যেকোনো দেশ, সংস্থার সাথে চুক্তি করতে হলে জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদে তা উত্থাপিত ও অনুমোদিত হতে হবে। জাতীয় সম্পদের মালিক জনগণ, কাজেই জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে এই সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করে সর্বক্ষেত্রে তা প্রতিনিধি পরিষদে আলোচনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে গ্রহণ করার এবং এ বিষয়ে জাতীয় বিকাশের প্রয়োজন মেটানোর বিধানাবলী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে সংবিধানে।

সরকার, প্রতিনিধি পরিষদ, আইন ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, জনপ্রশাসন:

বাংলাদেশের বর্তমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক, স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকাঠামোর মূলে রয়েছে এক ব্যক্তির হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা। এখানে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের ক্ষমতার কোনো বিভাজন নাই, সরকার জনগণের কাছে দূরে থাক, সংসদের কাছেও জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়, বিচারব্যবস্থা সরকারি হুকুমদারির অধীন, সংসদ অকার্যকর, স্থানীয় সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা নেই, সমগ্র শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ পেতে হলে এই ব্যবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবশ্যই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে এবং তাদের ভেতরে দায়িত্ব ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ থাকবে। জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরাই সরকার গঠন করবেন। জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদ হবে রাষ্ট্রের সকল নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় উন্নয়ন কাজের বাস্তবায়নের দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে তাদের জাতীয় নীতি প্রণেতার ভূমিকাকে কার্যকর করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বাধীনভাবে মতামত ও ভোট দেবার অধিকার থাকবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতেই যেকোনো আইন প্রণীত হবে। সাধারণভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমোদনক্রমে তা বলবৎযোগ্য হবে। এক্ষেত্রে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসার জন্য জনগণের রায়ের ওপরই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।

দেশে সাংবিধানিক শাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী সকল নাগরিকের সমঅধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ বিষয়ে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতে হবে। একইভাবে তাদেরকেও দেশের সংবিধান ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার অনুশীলন করতে হবে। এই লক্ষ্যে বর্তমানের সকল গণবিরোধী আইন ও উপনিবেশিক কাঠামো বাতিল করে একটি গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী আইন ও বিচার কাঠামো দ্বারা তা প্রতিস্থাপন করতে হবে।

বাংলাদেশে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের ব্যবস্থা একদিকে যেমন উপনিবেশিক কাঠামোরই ধারাবাহিকতা, তেমনি তা এখানে রাজনীতিবিদদের লুণ্ঠনকেন্দ্রিক তৎপরতা ও অযোগ্যতারও ফলশ্রুতি। জনগণের জীবনের ওপর এ ধরনের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আধিপত্যকে দূর করে সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব। উপনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামো অনুযায়ী জনগণকে অনুগত প্রজা হিসাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটিয়ে আমলাতন্ত্রকে জনগণের সেবকের ভূমিকায় কার্যকর করতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত নীতি অনুযায়ী দেশের প্রতিটি স্থানে নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ডের প্রাণ হতে হবে স্থানীয় সরকারকে। গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হলে গণক্ষমতা দিয়ে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার হবে এই গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র। সর্বক্ষেত্রেই স্থানীয় সরকারের সদস্যরা হবেন জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। জনগণের স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হলে তাকে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে সরিয়ে দেবারও ব্যবস্থা থাকবে। কোন অবস্থাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অনির্বাচিত প্রশাসক দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যাবে না। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সাথে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা ও সক্ষমতার বিচার করে স্থানীয় নীতিনির্ধারণ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচনী ব্যবস্থা:

বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অগণতান্ত্রিক চরিত্র ও দেশকে পরিচালনায় শাসকদের ব্যর্থতার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের অক্ষমতা। রাষ্ট্রক্ষমতাকে লুণ্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনসহ সকল প্রতিষ্ঠানকে তারা অকার্যকর করে ফেলেছে। এই ব্যর্থতাকে আড়াল করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামের গোঁজামিলের ব্যবস্থা দিয়ে পার পেতে চাইলেও এই ব্যবস্থারও দলীয়করণ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফাঁক-ফোকরে দীর্ঘস্থায়ী অসাংবিধানিক শাসনের সম্ভাবনা এই ব্যবস্থার কফিনে স্থায়ী পেরেক ঠুকে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে শাসনক্ষমতার দাবিদার দুই জোট ক্ষমতার স্বাদ পেতে যতটা আগ্রহী, তার কণামাত্রও একটা স্বাধীন নির্বাচনী ব্যবস্থার রূপায়ণে নয়। ফলে একটা স্বাধীন নির্বাচনী ব্যবস্থার রূপকল্প হাজির করার দায়িত্বও হয়ে পড়েছে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কাজ।

একটি স্বাধীন নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে-

ক. প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়ার জন্য সাংবিধানিক কমিশন গঠন করতে হবে।
খ. নির্বাচন কমিশনের বাজেট কমিশন কর্তৃক প্রণীত হবে এবং সাংবিধানিকভাবেই এই বাজেটের অর্থ বরাদ্দ প্রদানে অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে।
গ. সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচন কমিশনকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বতন্ত্র ও ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রত্যেক থানা পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেকোনো কর্মকর্তার প্রত্যাহারসহ তাদের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন। এর জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় লোকবল নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী বিধিমালা ভঙ্গকারী যেকোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ঘ. নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম খরচে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন। সেজন্য সকল প্রার্থীর জন্য কমিশন সমান প্রচারের ব্যবস্থা করবেন এবং কোটি টাকার ব্যক্তিগত প্রচারণা পদ্ধতি বাতিল করবেন। প্রার্থীতা এবং দল গঠনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান আইনে মৌলিক অধিকারবিরোধী অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল করতে হবে।

এই নির্বাচন কমিশনের কাজ হবে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে যুক্ত, দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতার ব্যবহার করে নিজস্ব আর্থিক সুবিধার সৃষ্টিকারী, যুদ্ধাপরাধী ও গণশত্রুদেরনির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিদের নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি।

জাতীয় প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি:

বর্তমান বিশ্বায়িত দুনিয়ায় নিজের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে বিশ্বের দরবারে আপন মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলাদেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই কর্তব্য সাধনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একই সাথে হতে হবে জাতীয় বিকাশের অনুকূল, গতিশীল ও যুগোপযোগী। এক্ষেত্রে সকল রাষ্ট্রের সাথে সমঅধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে। পরাশক্তির বৈশ্বিক আধিপত্য ও তার আঞ্চলিক পরিকল্পনাকে মোকাবেলার জন্য জাতীয় নীতি প্রণয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোট গঠনে নিতে হবে উদ্যোগী ভূমিকা। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তির আধিপত্য ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াইকে সমর্থন জানাতে হবে, তাদের সাথে সংহতি গড়ে তুলতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদের ভারতকেন্দ্রিক আধিপত্যের মোকাবেলায় এই অঞ্চলে আঞ্চলিক মৈত্রী জোরদার করতে হবে, ভারতের জনগণের সাথে মৈত্রীর মাধ্যমে এই আধিপত্যবাদী নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সার্বভৌম মর্যাদা ও সুষম স্বার্থের ভিত্তিতে দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে স্বাক্ষরিত সমস্ত গোপন ও প্রকাশ্য সামরিক-বেসামরিক চুক্তি বাতিল করে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে একদিকে যেমন সন্ত্রাসবাদ, অন্তর্ঘাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, তেমনি অন্যদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় সেনাবাহিনীকে জ্ঞান, তথ্য, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় বিকাশের প্রধান সৈনিক যেমন এদেশের জনগণ, তেমনি জাতীয় প্রতিরক্ষার রক্ষাকবচও জনগণ। জাতীয় সেনাবাহিনীকে তাই গণমুখী করতে হবে, জনগণকে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

আসুন জনগণের স্বপ্নকে সত্যি পরিণত করি

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট যে এই জাতীয় পুনর্গঠনের কাজ করতে সক্ষম নয় তাদের এত বছরের শাসনের মধ্য দিয়েই তারা তা প্রমাণ করেছে। দিনের পর দিন তারা লুণ্ঠনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে, দেশকে আরো বেশি বেশি করে পরনির্ভর করে ফেলছে আর নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে এমনভাবে বাড়িয়ে তুলেছে এমনকি ক্ষমতা পরিবর্তনের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও আর তারা অক্ষুন্ন রাখতে পারছে না। বরং এমন এক বৈরিতায় তা রূপান্তরিত হয়েছে যে তাদের এক পক্ষ অন্য পক্ষকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবার ভয়ঙ্কর খেলায় লিপ্ত হয়েছে। আর ফলাফলে তাদের নিজেদের সাথে সাথে গোটা বাংলাদেশকেই এক অস্তিত্বের সংকটে নিক্ষিপ্ত করেছে। এদের এই অক্ষমতা তাদের গঠন কাঠামো ও শ্রেণি চরিত্রের ভেতরেই নিহিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন শ্রেণি ও গোষ্ঠী প্রথম থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মত্ত হয়েছে দুর্নীতিলুণ্ঠনে। উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন এই শাসকরা ‘সমাজতন্ত্রের’ নামে প্রথম থেকেই বিনিয়োগ সিলিং নির্ধারণ করে উৎপাদনী খাত বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে। নিজেদের লুণ্ঠনের মাধ্যমে ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সাথে সাথে সিলিং সীমা বাড়লেও, প্রথম থেকেই উন্মুক্ত থেকেছে বিদেশী বিনিয়োগের সীমা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পের বারোটা বাজিয়ে, মধ্যসত্ত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করে জাতীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় অক্ষম ও অলাভজনক বানানো হয়েছে এবং বাজার সৃষ্টি করা হয়েছে বিদেশী পণ্যের। এরপর উদারীকরণ, বিরাষ্ট্রীয়করণ ইত্যাদির নামে প্রতিযোগিতা সৃষ্টির কথা বলে এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জলের দরে লুটেরাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে। এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অর্থাৎ জনগণের সাধারণ সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পরাশক্তিগুলোর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পরিচালিত, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির ওপর নির্ভরশীল এই শাসকদের দুঃশাসনে আজ বন্দি বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে জোট দুটি মৌলিকভাবে একই আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়েও মূলত দুটি পরিবারকে কেন্দ্র করে তাদের বৈরিতা ও সহিংসতার বলি করছে জনগণকে। গণতন্ত্রের নামে তৈরি হয়েছে পরিবারতন্ত্র এবং এক ব্যক্তির শাসন। এই স্বৈরাচারী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অগণতান্ত্রিক, লুণ্ঠনভিত্তিক শাসনব্যবস্থা আর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর অধীনস্ত দেউলিয়া রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি আজ একাকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণির প্রতিটি দল ও জোটকেই তাই আমরা দেখি আগের চাইতে আরও বেশি বেশি করে বিদেশী নানা শক্তির কাছে দেশকে উজাড় করে দিতে, লুণ্ঠন-দুর্নীতি-দুঃশাসনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলতে। এরা এদেশের শিল্প-কৃষিকে ধ্বংস করেছে। খনিজ সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে। নদীকে মেরে ফেলেছে, গাছপালা-বনভূমি ধ্বংস করেছে, নারীর ওপর চালিয়েছে অবিরাম বৈষম্য ও নির্যাতনের খড়গ, মানুষের শ্রমকে বানিয়েছে লুণ্ঠনমূলক শোষণের শিকার। নিজেদের লুণ্ঠনের রাজত্ব বহাল রাখতে এরা বিদেশী দূতাবাসের কিংবা নানা স্তরের প্রতিনিধিদের সামনে ধর্না দিয়ে দিয়ে আমাদের জাতীয় সম্মান ভূলুণ্ঠিত করছে প্রতিদিন। এই পরিস্থিতিকেই এরা চিরস্থায়ী বলে দেখাতে চায়। শাসকরা সব সময়ই পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে নাকচ করে, পরিবর্তনকে অসম্ভব প্রমাণ করতে চায়। যেন বা তাদের শাসনই চিরকালীন, এর আগে কেউ ছিল না, পরেও কেউ নেই। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পরিবর্তন সম্ভব। এই জনপদে বহু শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। ইংরেজরা এসেছে তাদেরও এদেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে, আবার সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের। শাসকদের বদল হয়েছে। ইতিহাস পরিবর্তনের পক্ষেই তার সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে। বর্তমান শাসকদেরও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। শুধু অবশ্যম্ভাবীই নয় তারা যেভাবে দেশ পরিচালনায় নিজেদের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, যেভাবে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ছে, এক বিচারহীন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, লুণ্ঠন সর্বব্যাপী ও চক্ষুলজ্জাহীন বাস্তবতা হয়ে উঠছে এবং শাসকদের ওপর থেকে সমস্ত বিশ্বাস জনগণ হারিয়ে ফেলছেন তাতে বলা যায় একটা বিরাটাকারের পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবর্তন করতে হলে সমাজের ভেতর থেকে পরিবর্তনের শক্তিকে উঠে আসতে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম এমন এক রাজনৈতিক দলের জন্ম দিতে হবে যারা সবার ওপরে স্থান দেবে জাতীয় স্বার্থকে। ব্যক্তি স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ নয় জাতীয় বিকাশ আর সাধারণভাবে মানবজাতির অগ্রগতির প্রয়োজনকে সামনে রেখে যারা এগিয়ে যাবে। এই এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব আজকের বাংলাদেশে আমরা যারা বসবাস করছি তাদেরই।

এই রূপরেখা আমাদের জাতীয় মুক্তির দিশা। এর প্রতিটি কর্মসূচিকে সত্যে পরিণত করতে তাই আমাদের অবতীর্ণ হতে হবে জীবনপণ সংগ্রামে। প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে একে বাস্তবায়নের সংগ্রাম করতে হবে। আমাদের এই দায় যেমন আমাদের পূর্বপুরুষের কাছে, তেমনি অনাগত প্রজন্মের কাছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা হাজার বছর ধরে যে লড়াই করেছেন তারই উত্তরাধিকার আমরা। এই সংগ্রাম কখনো বাউল, বৈষ্ণবদের হাতে হয়ে উঠেছে জাত-পাত বিরোধী সংগ্রাম, ভাবের অনুশীলন। কখনো মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে দেশিবিদেশী শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে। জন্ম দিয়েছে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল বিদ্রোহ, ব্রিটিশ বিরোধী বৈপ্লবিক সংগ্রাম, সিপাহী বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, নানকার বিদ্রোহ, ভাষা ও স্বাধিকারের আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান এবং এসব সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এ জনপদের মানুষের সবচেয়ে উজ্জ্বল অর্জন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের। এখনো সংগ্রামের সে ধারা বহমান। এদেশকে সংগ্রামে, নিষ্ঠায়, সৃজনশীলতায় এদেশের জনগণই আগলে রেখেছেন, তাদের পক্ষে যতদূর সম্ভব বিকশিত করছেন। কিন্তু এদেশের শাসনক্ষমতা জনগণের হাতে না থাকায়, জনগণের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকায় আমাদের মাথার ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছে এক জনবিরোধী শাসকগোষ্ঠী। আমাদের এই দেশটাকে কিছুতেই আমরা মুষ্টিমেয় লুটেরা আর পরাশক্তির দখলি তৎপরতার হাতে তুলে দিতে পারি না। এই দেশ আমাদের, এর দায়িত্বও আমাদেরই নিতে হবে। পূর্ববর্তী সকল সংগ্রামের নির্যাস নিয়ে এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে তাই আজ ইতিহাসের ভেতরই আমাদের নিজেদেরকে স্থাপন করতে হবে।

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম যে চূড়ায় পৌঁছেছিল সেটাই আগামীর বাংলাদেশ গঠনের সূচনাবিন্দু। এদেশে এযাবৎকাল যারা ক্ষমতাসীন হয়েছে তারা মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিপরীতে এমনভাবে বাংলাদেশকে পরিচালিত করেছে যে, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার বাংলাদেশ আর এই শাসকদের স্বার্থের বাংলাদেশ পরস্পর বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এদেশের মানুষ দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও আজ জনগণের কাঁধে এসে পড়েছে। জনগণ তাদের এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন তার নিজস্ব শক্তি সংগঠিত করে, তার দল গড়ে তুলে। গণসংহতি আন্দোলন তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই দল হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে, যোগ্য করে তুলতে তার সংগ্রাম পরিচালনা করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি পরিবর্তন সম্ভব এবং জনগণের সংগঠিত প্রতিরোধই এই পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি। আমাদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়, ইতিহাস নির্ধারিত কর্তব্য পালনের মাধ্যমেই সম্ভব এই পরিবর্তনকে বাস্তব করে তোলা।

সে স্বপ্ন পূরণ করতে যে দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রয়োজন তার প্রতিটি ধাপে জনগণের শক্তিকে সংগঠিত করে সংগ্রাম গড়ে তুলতে চাই আমরা। বাস্তবতা আমাদের সংগ্রামের প্রতিটি স্তরেই তার কৌশলকে তৈরি করবে, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় অঙ্গীকার সেই সংগ্রামকে পথ দেখাবে। জনগণের রাজনৈতিক প্রতিরোধের পথেই বাংলাদেশে জনগণের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আসতে পারে। গণসংহতি আন্দোলন সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ।