অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম
প্রথম নির্বাহী সমন্বয়কারী, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি
জন্ম: ২৯ নভেম্বর ১৯৪৯-মৃত্যু: ২৬ মে ২০১৭

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অ্যাড. আবদুস সালাম একটা গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর একেবারে ছোটবেলায় অষ্টম শ্রেণী থেকে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সারাজীবন তিনি মানুষের মুক্তির রাজনীতিতে যুক্ত থেকেছেন।
১৯৬০ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হলে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং তিনি সংগঠনের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৬২ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজশাহীতে চলে এসে কায়েদে আযম উচ্চ বিদ্যালয়ে পুনরায় অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন (বর্তমানে রাণীনগর মডার্ন হাইস্কুল, তালাইমারী, রাজশাহী)। পরবর্তী কালে ১৯৬৫ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেন। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। শুরু থেকেই তিনি মার্কস এঙ্গেলসের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হন এবং সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির সাথে নিজেকে যুক্ত করেন।
রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তখনকার রীতি অনুযায়ী চীনা বা রুশ কোন একটা মডেল অনুসরণ করে তাতে নিজেকে সঁপে দেবার অভ্যস্ত পথে তিনি হাঁটেন নি। প্রতিনিয়ত অনুসন্ধান জারি রেখেছেন।
পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হয়ে পড়লে এই বিভক্তির কোনো অংশেই রাজনৈতিক কারণে যুক্ত না হয়ে পৃথক অবস্থান নেন। প্রগতিশীল ছাত্রমৈত্রী, মার্ক্সবাদী লেখক সংঘ, বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী সম্মেলন নামে তিনটি সংগঠনের অন্যান্য সাথীদের নিয়ে একটা মোর্চা গড়ে তোলেন এবং নতুন রাজনৈতিক অবস্থান নেন।
মার্কসবাদী লেখক সংঘের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলার জনগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের কর্মসূচি তুলে ধরেন। এই তিনটি সংগঠন ‘মাইতী গ্রুপ’ নামে বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে পরিচিত। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে মাইতী গ্রুপের নেতৃত্ব হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাজশাহী অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তাঁর সহযোদ্ধা ও ইতিহাস রচয়িতারা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি শুধু ৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধ করেননি বরং চিরকালই মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের এক যোদ্ধা থেকে গেছেন। নিজের জীবন থেকে ব্যক্তি সম্পত্তির সমস্ত দাগ তিনি মুছে ফেলেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি সর্বহারা পার্টির সাথে যুক্ত হন। কিন্তু অচিরেই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে নিজেকে সর্বহারা পার্টি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও নেতা হিসেবে ভ’মিকা পালন করেন। এ সময় রাজশাহী অঞ্চলে তাঁকে অনেকেই ‘লাল সালাম’ নামেই ডাকতেন।
পরবর্তী কালে জনমুক্তি পার্টি গঠনের উদ্যোগের সাথে যুক্ত হন। জনমুক্তি পার্টির রাজনৈতিক কার্যক্রমের বিভিন্ন প্রশ্নে ভিন্নমতের কারণে ১৯৭৮ সালে জনমুক্তি পার্টি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেন। ১৯৮৯ সালে ‘ঐক্য প্রক্রিয়া’ গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হন। এবং ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা হিসেবে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনে ভ’মিকা পালন করেন। ঐক্য প্রক্রিয়াকে ১৯৯৬ সালে গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টিতে রুপান্তরিত করেন তাঁরা। এরপর আবদুস সালাম গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ও বাম ফ্রন্টে সক্রিয় থাকেন। বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট রাজনৈতিক অবস্থানে সম্পূর্ণ একমত হতে না পারায় বামফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে এসে ৪ বাম দল গঠনে উদ্যোগী ভ’মিকা নেন। পরবর্তীতে ৫ বাম দলের অন্যতম নেতা হিসেবে ভ’মিকা পালন করেন। ২০১০ সালে ৫ বাম দলের অন্যতম শরিক দল গণসংহতি আন্দোলনের সাথে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনকে একত্রিত করেন এবং গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্তব্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে তাঁর চিন্তা বিস্তৃত হয়েছে বহু ক্ষেত্রে। তিনি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা. মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর রচনায়। রাষ্ট্রের সংবিধান, যা সমস্ত আইনের ভিত্তি এবং নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আশ্রয় হবার কথা, তার পর্যালোচনায় তিনি তাঁর মনোযোগের অনেকটাই নিবেদন করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ঠগুলো চিহ্নিত করে তার পর্যালোচনা হাজির করেছেন তিনি। কীভাবে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভ’মিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন, কীভাবে বাজেট প্রণয়নে তাদের অংশগ্রহণের পথ কার্যত রুদ্ধ করা হয়েছে, কেমন করে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সাংবিধানিক আয়োজন করা যেতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে তিনি পথ নির্দেশনামূলক আলোচনা করেছেন।
সর্বোপরি তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্তব্যকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। শ্রমিক শ্রেণি যে কোন ঐতিহাসিক পর্বে, সেই পর্বের যে ধরনের পরিবর্তন সম্ভব সেই ধরনের পরিবর্তনই করতে পারে, এমনকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও যে শ্রমিক শ্রেণীরই কাজ সেই উপলব্ধিও তিনি চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। মার্কসবাদকে সবসময়ই একটা চিন্তা পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে তিনি কোন একটা দেশের/অঞ্চলের ইতিহাসের বিকাশের মধ্যে তাকে স্থাপন করে সেই দেশের জন্য বিপ্লবী কর্তব্য স্থির করায় বিশ্বাসী ছিলেন।