You are currently viewing ইতিহাসের পাতায় ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবস ”আটলান্টিকের ওপারের সৈনিক ও বঙ্গোপসাগরের পারের উত্তরসুরীরা

ইতিহাসের পাতায় ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবস ”আটলান্টিকের ওপারের সৈনিক ও বঙ্গোপসাগরের পারের উত্তরসুরীরা

(নারী দিবস নিয়ে তাসলিমা আখতারের এ লেখাটি গতবছর নিউ এইজে ছাপা হয়েছিলো। বাংলা লেখাটি সবার জন্য পূনরায় প্রকাশ করা হল)

১১১ বছরে পা রাখলো নারী দিবস। প্রতি বছর এই সময় আমাদের দেশের পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় ‘মহিয়সী’, ‘সফল’ নারীদের সাফল্য গাঁথা। পত্র-পত্রিকা-টিভিতে পণ্যের বিজ্ঞাপন জোয়ারেও নারীই হয় প্রতিপাদ্য। সরকারী-বেসরকারী সংস্থা ও নারী সংগঠন পালন করে বিশেষ আয়োজন। মুল ধারার প্রচারণায় উপস্থিত হয় প্রধাণত মধ্যবিত্ত পরিসরের নারীরা। চারপাশের সমস্ত আয়োজনে মনে হয়, ফেলে আসা দিনের মতো যেন আড়ালে পড়ছে ৮ মার্চের সৈনিক ‘নারী পোশাক শ্রমিক’ এবং তাদের উত্তরসুরী–এই দুইয়ের অবদান। শ্রমজীবি নারী ভুমিকা স্বীকার না করার শ্রেণী ভাবনাই ঐতিহাসিক এই দিনের তাৎপর্য থেকে বরাবর বাদ দিতে চেয়েছে শ্রমজীবিকে। শ্রমজীবি নারী দিবস তাই পরিণত হয়েছে কেবলই নারী দিবসে কিংবা মধ্যবিত্তের নারী দিবসে। তাই এবারের নারী দিবসে স্মরণ করতে চাই ঐ দুই দলের নারীদেরকে। যাদের একদলকে খুঁজবো ইতিহাসের পাতায়। আর আরেক দলকে বর্তমানে। একদল আটলান্টিকের ওপারে আর আরেকদল বঙ্গপোসাগর ঘেঁসে।

প্রকৃত ঘটনা হলো আটলান্টিকের ওপারে আমেরিকা মহাদেশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের পোশাক শ্রমিক নারীরাই সুত্রপাত ঘটিয়েছিলো নারী দিবসের। অন্যদিকে তাদের-ই উত্তরসুরী হয়ে বঙ্গোপসাগর ঘেসে এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের নারী পোশাক শ্রমিকরা এদেশে অর্থনীতি বিকাশে নিজেদের জীবন জীবিকা তারুণ্য প্রাণ পুষ্টি বিসর্জন দিচ্ছে প্রতিদিন। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ পোশাকে সেলাই করে পশ্চিমের বাজারে পৌছাবার প্রক্রিয়ায় এরাই হয়েছে গ্লোবালাইজেশনের অংশ। নারী দিবসের এতো বছরে ইতিহাসের সেই উত্তরসুরী আমাদের দেশের নারী পোশাক শ্রমিকদের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি এবং সংগ্রামের হিসাব কশতে চাই আজকের দিনে। আর তাই প্রথমেই ফিরতে চাই অতীতে। উনবিংশ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের বিকাশ ঘর গেরস্থালীর ব্যক্তিগত জীবন থেকে নারীকে জনপরিসরের আঙ্গিনায় টেনে আনে। নারী পৌছায় কারখানায়, পরিণত হয় শ্রমিকে। বাজারের সাথে যুক্ত হয় তার শ্রম। বাদ যায় না ঘরের কাজও। দ্বৈত বোঝা বয়ে সমাজের বিকাশ ধারায় হাটতে থাকে নারী। অনেকগুলো কাজ পরিচিত হয় কেবল নারীর হয়ে। এভাবেই বোঝা বাড়ে কাঁধে। অবসরহীন নারী বঞ্চিত হয় সামাজিক পরিসরে কর্তাসত্তা হয়ে উঠবার সুযোগ থেকে, বঞ্চিত হয় নাগরিক হিসাবেও। এরপরেও কারখানার জনপরিসর ঘরের চৌহদ্দী থেকে দুরে এনে যুক্ত করে নারীদের আরো আরো শ্রমিক ও নতুন চিন্তার সাথে। সেই যুক্ততাই সাহস হয় লড়াইয়ের।

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় দশক পর্যন্তু কলকারখানার বিকাশ হলেও কাজের পরিবেশ ছিলো ভয়াবহ। ঐ সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা বেঁচে থাকার আশায় পাড়ি জমায় আমেরিকার। তাদেরও অনেকের কাজ হয় পোশাক কারখানায়। সেইসময় কারখানায় ছিলো না কাজের মানসম্মত পরিবেশ, কাজ করতে হতো ১৫-১৬ ঘন্টা, শিশু শ্রম ছিল স্বাভাবিক বিষয়। কম মজুরি, কম পুষ্টি, কম ক্যালোরী ছিলো আজকের দিনের বাংলাদেশের শ্রমিকদের মতো তাদেরও সঙ্গী। থাকার জায়গাও ছিলো বস্তির মতো এলাকায়। লুইস হাইন এবং জ্যাকব রিসের আলোকচিত্রে এবং রবার্ট এফ ওয়্যাগন্যার লেবার আর্কিভ এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির আইএলআর স্কুলের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেবার এন্ড রিলেশন) ‘খিল সেন্টারে’ও ঐ সময়ের কারখানা আর জীর্ণঘরে শ্রমিক নারী ও শিশুদের জীবনের দুর্দশার চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। এমনি পরিস্থিতিতে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুই তৈরির কারখানার তরুণ নারীরাই সাহস করে মাঠে নামে প্রথম। তারা দাবি তোলে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ, ৮ শ্রম ঘন্টা এবং মজুরি বৃদ্ধির। পুলিশের হামলা-নির্যাতন এবং গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আন্দোলন দমন করা হয়। তাতেই ক্ষান্ত হয় না তারা, ক্ষোভ শক্তিতে পরিণত হয়। স্বস্ফ’র্ততার জায়গা সংগঠিত হবার তাগিদ অনুভত হয় নারী শ্রমিকদের মধ্যে । মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৮৬০ সালের মার্চ মাসেই সুই কারখানার ঐ শ্রমিকরা গঠন করে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন।

তারই ধারাবাহিকতায় প্রায় ৫০ বছর পর ১৯০৭ সালে আবারও হাজার হাজার নারী শ্রমিক নিউ ইয়র্কের রাজপথে দাবি তোলে। এবারের আন্দোলনে পুরণো দাবির সাথে যুক্ত শিশু শ্রম বন্ধ এবং নারীর ভোটাধিকারের দাবি। এভাবে প্রতিবাদ চলতে থাকে ১৯০৮ সালের নিউইয়র্কের মিছিলে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক অংশ নেয়। সেই বিশাল মিছিল ম্যানহ্যাটেনর লোয়ার স্ট্রাটের রুটগারসে মিলিত হয়। ঐতিাহিসক সেই মিছিলের দিনটি ছিল ৮ সার্চ ১৯০৮। এক বছরে ১৯০৯ সালে একই দাবিতে ৩০ হাজার শ্রমিক ১৩ সপ্তাহ ধর্মঘট পালন করে। আমেরিকার স্যোশালিস্ট পার্টি ১৯০৯ সালে আমেরিকায় নারী দিবস পালনের ঘোষণা দেয়।

ঐ সময়ে শিল্পবিপ্লবের কালে ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিলো ট্রেড ইউনিয়নসহ অন্যান্য দাবিতে। এসবের সুত্র ধরে ১৯০৭ ও ১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় স্টুটগার্ট এবং কোপেন হেগেনে। কোপেন হেগেনের সম্মেলনে ১৯১০ সালে জার্মানীর সামাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব দেয় সারা দুনিয়া ব্যাপী ৮ মার্চকে নারীর সংগ্রাম পর্যালোচনা এবং নতুন দিশা ঠিক করার বিশেষ দিবস হিসাবে পালনের। এর থেকে পালিত হতে থাকে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবস।

১৯১৭ সালের ৮ মার্চে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং নারী ও শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আলেক্সান্ড্রা কোলনতাইয়ের নেতৃত্বে ‘রুটি ও শান্তির’ দাবিতে পেট্রোগ্রাদে মিছিল করে নারী শ্রমিকরা। নারীদের সেই লড়াই জারের পতনের পর্যন্ত বিস্তার হয়। ১৯১৭ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে নারীরা ভোটাধিকার পায় একই সাথে সকল কাজে সমান অংশগ্রহণ সমান মজুরি স্বীকৃত হয়। এছাড়া ঐ সময় রাশিয়ায় নারীরা অগ্রসর পারিবারিক আইন, মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ নানান সুযোগ পান। এভাবেই ৮ মার্চের আন্দোলন ইউরোপ আমেরিকায় নারীর ভোটাধিকার এবং ট্রেডইউনিয়নের অধিকার আদায়ের প্রশ্নকে সামনে নিয় আসে। বর্তমানে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে নারী দিবসে সরকারী ছুটি এবং কয়েকটি দেশে কেবল নারীদের ছুটি থাকলেও খোদ আমেরিকায় কোন ছটি নেই। অবশ্য ১৯২০ সালে ভোটাধিকার পায় আমেরিকার নারীরা। পরবর্তীতে পুঁজিবাদী বিশ্বের উত্থাপন ইতিহাস থেকে শ্রমজীবী নারীদের ভুমিকাকে ভুলিয়ে রাখার প্রবণতা প্রধান হয়ে উঠতে দেখা যায়।ইউরোপে যখন শিল্প বিকাশের জোয়ার যখন তখনও ভারত বর্ষে শ্রমিক হিসাবে নারীর উত্থান ঘটেনি। উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রোকেয়ারা বিধাব বিবাহ, সতীদাহ বন্ধ এবং নারী শিক্ষার জন্য আন্দোলন করছিলে। ঐ সময়ে এই বাংলায় রোকেয়া নারী আন্দোলনের এক শক্তিশালী স্বর হিসাবে হাজির হয়। তখন পর্যন্ত নারীর শিক্ষাকেই নারী মুক্তির পথ হিসাবে দেখানো হতো। ব্রিটিশ শাসনের পর পাকিস্তান আমল গড়িয়ে বাংলাদেশের শাসন আমলের গোড়ার দিকে শ্রমিক নারীর উদ্ভব ঘটেনি বললেই চলে। তারপরও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন এবং ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ এই অঞ্চলের কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো উল্লেখযোগ্য।

নতুন দেশ হিসাবে পত্তনের পর জুট মিল, কাগজের মিলসহ বেশ কিছু কল কারখানায় পুরুষরাই ছিলো প্রধান। পরবর্তীতে চা শ্রমিকদের মধ্যে নারীদের শ্রমিক হিসাবে যুক্ততা লক্ষ্যনীয় মাত্রায় সামনে আসে। কিন্তু মুলত নতুন শ্রমশক্তি হয় নারী শ্রমিকের বিকাশ হয় ৮০ এর দশকে পোশাক কারখানার বিকাশের মধ্য দিয়ে। শিল্প ও পুজি বিকাশে পিছিয়ে থাকা দেশ বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীরা যারা গ্রামে গঞ্জে বসাবাস করতো, যাদের বাজারের সাথে ছিলো না কোন পরিচয়; সেই নারীরাই পৌছে যায় বাজারে।

এ যেন ইতিহাসেরই পূণরাবৃত্তি। অনেক চিত্র মিলে যায় আমেরিকার পোশাক শ্রমিকদের সাথে। শুরুতে কম মজুরি, শিশু শ্রমিক, অনিরাপদ কাজের পরিবেশ এ-সমস্তই বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনেও ভয়াবহতা তৈরি করেছিলো। সস্তা, অদক্ষ, অনুগত এবং আন্দোলনবিমুখতার নারীদের ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য এ খাতে বিবেচ্য হয়। ৯৩০ টাকার মজুরির বিরূদ্ধে আন্দোলনে ২০০৬ সালে মজুরি প্রথম বৃদ্ধি করা হয় ১৬৬২ টাকা। বতর্মানে শ্রমিকদের মজুরি ৮০০০ টাকা। যদিও বরাবর শ্রমিকদের আংকাঙ্খার থেকে অনেক কম মজুরিই বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানেও শিশু শ্রমিক থাকলেও আইনগতভাবে ১৮ এর নীচে শ্রমিক কারখানায় কাজ করার স্বীকৃত নেই। কিন্তু নানা গবেষণায় দেখা য়ায় পোশাক কারখানায় শিশু শ্রমিকরা কাজ করছে।

নিউ ইয়র্কে ১৯১১ সালের ট্রায়েঙ্গেল সোয়েটারে আগুন লেগে প্রাণ হারানো ১৪৬ জনের মতো বাংলাদেশের স্পেক্ট্রাম, তাজরীন, রানা প্লাজার মতো অনিরাপদ কারখানায় প্রাণ হারায় হাজারও শ্রমিক। ট্রায়েঙ্গেল সোয়েটারের ঘটনার পর বেশ কিছু আইনের পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের আইনে বড় কোন পরিবর্তন হয়নি। বদল হয়নি ক্ষতিপুরণের আইন, শাস্তি পায়নি দোষীরা। তবে আন্দোলনের চাপে বিদেশী বায়াররা রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপুরণের নামে এক ধরণের আর্থিক সহযোগিতা দিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি রানা প্লাজার ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমের বাজারে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন চাপ। যাতে শ্রমিকদের জীবনবস্থা নিয়ে সবার উদ্বেগ বেড়েছে। এই সমস্তই যতটুকু হয়েছে তার পেছনে শ্রমিকদের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রেখেছিলো। গত ৩ দশকে পোশাক খাতের শুরুতে নড়বড়ে অবস্থা থাকলেও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মজুরি বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয় নিরাপত্তার প্রশ্ন গুরুত্বের সাথে সামনে এসেছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের ধরন,সচেতনতা ও সংগঠিত হবার ধরন ইত্যাদির মধ্যেও এসেছে পরিবর্তন। দ্বিতীয় প্রজন্ম কাজ করছে এখন এই খাতে। নতুন ভাবনা ও দাবি তৈরি হয়েছে কারখানা নিরাপত্তা ও ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে। সাথে নারীর স্বাস্থ্য, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ডে কেয়ার, নিরাপত্তা এবং যৌন হয়রানী বিরোধী পরিবশের দাবিও শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে যোগ হচ্ছে। নানা গবেষণায় উঠে আসছে কারখানার ভেতর নারী শ্রমিকের ওপর নানা যৌন হয়রানীর ঘটনাও। সারা দেশে ধর্ষণ বৃদ্ধির ঘটনা থেকে মুক্ত নয় পোশাক শ্রমিকরাও। আশুলিয়া এবং কাফরুলে পোশাক শ্রমিক গণ ধর্ষন তারই নজির।

১১১ বছর পরেও আজকের ৮ মার্চে আমাদের দেশে নারী পোশাক শ্রমিকরা মোকাবিলা করছে নতুন নতুন বাধা ও চ্যলেঞ্জ। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে স্বাধীন মত প্রকাশ ও ভোটাধিকার চর্চা অধিকারের অভাব, গণতন্ত্র ও বিচারহীনতার প্রভাব থেকে শ্রমিকরাও মুক্ত নয়। বরাবরের মতো একটি বড় চ্যালেঞ্জ শ্রমিকদের প্রতিবাদ সংগঠিত করা বা ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা করার সযোগ না থাকা। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে এমন সিন্ডিকেটের মতো ব্যবস্থা জেঁকে আছে যাতে শ্রমিকরা যাতে প্রতিবাদ করতে না। এসবের পাশাপাশি নতুন যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে যাচ্ছে শ্রমিকরা তা হলো অটোম্যাশন। পোশাক খাতে ৪০০০ কারখানায় শ্রমিকরা ৪০ লাখের মধ্যে ৬০ ভাগেরও বেশী নারী। রপ্তানী আয়ের মোট ৮০ ভাগই আসে এই খাত থেকে। পুর্বে এই কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা ছিলো ৪৪ লাখ যার ৮০ ভাগই ছিলো নারী। এই যে ৮০ ভাগ থেকে ৬০ ভাগে এসে দাড়ালো তার একটা প্রধান কারণ অটোম্যাশন। খরচ কমানো, উৎপাদন বৃদ্ধি করার পাশাপাশি পরিবর্তনশীল ব্যবসার ধরনের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতেই এই অটোম্যাশন চলছে।

এক্সেস টু ইনফরমেশন (ধ২র) এবং আইএলও এর এক গবেষণায় বলা হয় আগামী ২০৪০ এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক বা ৬০ ভাগ শ্রমিক কাজ হারাবে এই অটোম্যশনের কারণে। অটোম্যাশনের সবচেয়ে বেশী পড়বে পোশাক খাতের উপর। সিপিডির মতে ‘অটোমেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের কারণে এ খাতে নারী শ্রমিকদের হার কমতে থাকবে। এবং মালিকরা মনে করে আধুনিক প্রযুক্তিরসাথে খাপ খাওয়াতে নারীরা সক্ষম না।’ ফলে আমরা দেখছি যেই প্রযুক্তি নতজানু বাধ্য নারীদের ঘরের বাইরে এনেছিলো ঝাঁকে ঝাঁকে সেই প্রযুক্তির বিকাশই আবার নারীকেই পথে নামাচ্ছে।

তবে গবেষকদের তথ্য ছাড়াই বলা যায় নারী শ্রমিকরা বেশী মাত্রায় ছাটাাঁই হচ্ছে তার প্রকৃত কারণ কেবল ট্রেনিং এর অভাব নয়। বরং সামজিক ভাবে শিক্ষাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কম পাবার কারণে এবং কারখানার পাশাপাশি গার্হস্থ্য সকল কর্মের বোঝা নারীর কাঁধে থাকায় নারীরা পেশাগত জায়গায় পিছিয়ে পড়ছে। সেকারনে কারখানায় সুপারভাইভার, লাইনচীফ সহ উপরের গ্রেডগুলোতে নারী শ্রমিকদের উপস্থিতি দেখা যায় না। সামাজিক বাস্তবতাই বাধ্য করে পেশাগত জায়গায়্ নারীকে পিছিয়ে পড়তে। বর্তমানে অটোম্যাশন মোকাবিলায় ট্রেনিং এর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্রয়িভাবে ডে কেয়ার, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধি এবং গার্হস্থ্যশ্রমের ঘানি থেকে নারীকে মুক্ত না করা হয় তাহলে নারী অটোম্যাশনের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রীয় ভাবে এবং মালিকদের পক্ষ থেকে অটোম্যাশনের সাথে খাপ খাওয়াতে এই শিল্পের বিকাশে ভুমিকা রাখা নারীরা যাতে যথাযথ ছিটকে না পড়ে তার উদ্যোগ নিতে হবে।

বর্তমানে পোশাক কারখানায় দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। এই নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য উপযোগী কর্ম পরিবেশের ও গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের জন্য আন্দোলন করতে হবে। মোকবিলা করতে হবে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে জাতীয় রাজনীতর মতো শ্রমিক আন্দোলনেও নারী নেতৃত্বর সংখ্যা কম। এ আন্দোলনে নারী নেতৃত্ব সামনে আসলে নারীর প্রশ্ন জোরের সাথে সামনে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এই সময়ে নারী আন্দোলনের কর্মীদের ‘শ্রমিক শ্রেণীর নারীর’ দাবি আন্দোলনে শক্তিশালীভাবে যুক্ত করার কোন বিকল্প নেই। কেবল মধ্যবিত্ত পরিসরের আন্দোলন সমাজে নারীর অধিকার বা গণতান্ত্রিক অধিকার কোনটাই অর্জনে সহায়ক হয় না। ইতিহাসই দেখিয়েছি সমাজে মেনতি এবং শ্রমজীবী শ্রেনীর লড়াই সংগ্রামে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে এবং তারাই জীবনের ঝুঁকি নেয় সবচেয়ে বেশী। সমাজের বড় অংশই শ্রমজীবীরা। তাদের বাদ দিয়ে কেবল মধ্যবিত্ত পরিসরে দাবি দাওয়া তোলা কানাগলিতে আটকে থাকা হবে। যেই কানা গলি থেকে বেরিয়ে প্রশস্ত ময়দানে আসতে আসতে হবে। আর তার জন্য শ্রমিক নারী এবং সমাজের নানা বৈষম্যমুলক পরিচয়ের গন্ডিতে আটকে থাকা নারীর অধিকারের প্রশ্নে একত্রীতভাবে আন্দোলন অগ্রসর হওয়া ছাড়া নারী আন্দোলনের আর কোন পথ নেই।

লেখক: তাসলিমা আখতার
সভাপ্রধান গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি ও আলোকচিত্রী
৭ মার্চ ২০২০
taslima_74@yahoo.com

তথ্যসূত্র:
Where Did International Women’s Day Come From?
BY STEPH SOLIS MAR 9, 2013
international Women’s Day: Past, Present, Future:
Submitted by Janine on Fri, 16/03/2007
The Origins of International Women’s Day
by Mary DavisThe Centenary of the Russian Revolution
শ্যামলী শীল: নারী দিবসের ১০০ বছর পুর্তি এবং শতবছওে বাঙ্গালী নারীর অবস্থান: মুক্তস্বর: নারী দিবসের ১০০ বছরপুর্তি সংখ্যা। ২০১০।
আনু মুহাম্মদ: শতবর্ষে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও তার অন্তর্গত শক্তি:মুক্তস্বর: নারী দিবসের ১০০ বছর পুর্তি এবং শতবছওে বাঙ্গালী নারীর অবস্থান: মুক্তস্বর: নারী দিবসের ১০০ বছরপুর্তি সংখ্যা। ২০১০।
নেসার আহমেদ, শ্রম দিবস, নারী দিবস ও পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক
Artificial intelligence and labour rights in the ready-made garments sector in Bangladesh by : Munir Hasan, Fayazuddin Ahmad, Partha Sarkerhttps://www.giswatch.org/e/6157…
নিট শ্রমিকদের দেয়া হবে আয়রন ট্যাবলেট
ট্রায়াঙ্গল থেকে রানা প্লাজা প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ- তাসলিমা আখতার

6সৈকত আরিফ, Shumi Reksona and 4 others1 Comment

Leave a Reply